১৩ । রাদ
মাক্কী সূরা । আয়াত সংখ্যাঃ ৪০ । পারাঃ ১৩ ।
নামকরণঃ
এই সূরাটির নামকরণ করা হয়েছে
এর ১৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত 'আর-রাদ' (الرعد)
শব্দটি থেকে, যার অর্থ হলো 'বজ্র' বা বজ্রধ্বনি; যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে বজ্র আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা
ঘোষণা করে।
নাযিলের প্রেক্ষাপটঃ
এটি মূলত একটি মাক্কী সূরা (যদিও কিছু মুফাসসিরের মতে
এটি মাদানী) যা মক্কী জীবনের
শেষভাগে নাযিল হয়। সে সময়
ইসলামের দাওয়াত দীর্ঘদিন ধরে চলছিল, কিন্তু কাফেররা তা প্রত্যাখ্যান করে নবী (সা.)-কে লাঞ্ছিত করছিল
এবং তাঁর মিশন ব্যর্থ করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছিল । এই সূরার ১৩ নম্বর আয়াত (وَيُرْسِلُ
الصَّوَاعِقَ...) নাযিলের পেছনে
একটি বিশেষ ঘটনা বর্ণিত আছে। একটি বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী,
নবী (সা.) একজন জাহেলী সরদারকে ইসলামের
দাওয়াত দিলে সে অবজ্ঞাসূচকভাবে জিজ্ঞেস করে যে, আল্লাহ কী দিয়ে তৈরি (লোহা,
তামা,
সোনা?)। তৃতীয়বার দাওয়াত দেয়ার পর আল্লাহ তার উপর বজ্রপাত প্রেরণ
করে তাকে ধ্বংস করে দেন এবং এই আয়াত নাযিল হয় । অন্য একটি বর্ণনায়, আরবাদ ইবনে কায়েস ও আমের ইবনে তুফায়েল নামক দুই ব্যক্তি
রাসূল (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহর ক্ষমতা নিয়ে ধৃষ্টতা দেখায়;
তখন তাদের একজনের ওপর আকাশ থেকে
বজ্রপাত হয়। আল্লাহ তাআলা এই সূরার মাধ্যমে তাঁর অসীম শক্তি,
তাওহীদ এবং প্রকৃতির নিদর্শনের অকাট্য
প্রমাণাদি তুলে ধরেন।
আলোচ্য বিষয়ঃ
সূরা রা‘দ মূলত কুরআনের সত্যতা, রাসূল মুহাম্মদ ﷺ-এর দায়িত্ব
এবং আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন সম্পর্কে আলোচনা করে। সূরার শুরুতে বলা হয়েছে, কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সত্য হলেও
অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনে না এবং নবী ﷺ-এর দায়িত্ব কেবল
মানুষের কাছে ওহী পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ আকাশকে খুঁটি ছাড়া উঁচু করে রাখা, সূর্য-চন্দ্রের নির্দিষ্ট গতিপথ, পৃথিবীতে পর্বত-নদী, বিভিন্ন ফল-ফসল, দিন-রাতের পরিবর্তন ইত্যাদি অসংখ্য নিদর্শনের মাধ্যমে তাঁর একত্ব ও ক্ষমতার
প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি মানুষের অন্তরের গোপন-প্রকাশ্য সব জানেন, গর্ভের সব অবস্থাও জানেন এবং মানুষের সামনে-পেছনে প্রহরী নিযুক্ত করেছেন;
তবে তিনি কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরা
নিজেদের পরিবর্তন করে। বজ্রধ্বনি ও ফেরেশতারা তাঁর প্রশংসা করে এবং প্রকৃত ডাক কেবল
তাঁরই প্রাপ্য। কাফিররা পুনরুত্থান অস্বীকার করে, নিদর্শনের দাবি
করে এবং দুনিয়ার জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে; কিন্তু তাদের ডাক
নিষ্ফল, দুনিয়াতেও তাদের জন্য শাস্তি আছে এবং আখিরাতের শাস্তি
আরও কঠিন। অপরদিকে মুত্তাকীদের গুণ হলো আল্লাহর অঙ্গীকার রক্ষা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, সালাত কায়েম করা,
গোপনে-প্রকাশ্যে ব্যয় করা, অন্যায়ের মোকাবিলা ন্যায়
দ্বারা করা এবং ধৈর্য ধারণ করা; এর প্রতিদান হিসেবে তারা স্থায়ী
জান্নাতে প্রবেশ করবে, যেখানে ফেরেশতারা তাদেরকে শান্তির সম্ভাষণ
জানাবে। সূরাটি শেষ হয়েছে এই ঘোষণা দিয়ে যে নবীর কাজ কেবল দাওয়াত পৌঁছানো, আর হিসাব গ্রহণ করবেন আল্লাহ নিজেই; শেষ পর্যন্ত সত্যের
বিজয় নিশ্চিত।






No comments:
Post a Comment